Monday , June 25 2018
Home / ধর্ম ও জীবন / ওমর (রা.) এর শাসন পদ্ধতি

ওমর (রা.) এর শাসন পদ্ধতি

হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) আমিরুল মুমিনিন উপাধি ধারণ করে ২৩ জমাদিউস সানি ১৩ হিজরি মোতাবেক ২৪ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। খেলাফত লাভের পর তিনি মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! আমি দুর্বল, আমাকে শক্তি দিন। হে আল্লাহ! আমি রূঢ় মেজাজের অধিকারী, আমাকে কোমলপ্রাণ বানিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আমি কৃপণ, আমাকে দানশীল বানিয়ে দিন।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত)। তার খেলাফত লাভের পর দিগি¦দিক রাজ্য জয় হয়ে ইসলামী হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। তিনি তার বিশাল রাজ্যকে ন্যায়-ইনসাফ আর নিয়ম-নীতি দিয়ে ঢেলে সাজান। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তা তুলে ধরেছেন মোস্তফা কামাল গাজী

১. মজলিসে শূরা: ওমর (রা.) এর শাসননীতির অন্যতম ছিল মজলিসে শূরা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব কাজের সিদ্ধান্ত মজলিসে শূরার সদস্যদের পরামর্শক্রমে হতো। আলী, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়াজ ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব, জায়েদ ইবনে ছাবেত (রা.) প্রমুখের মতো বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছিলেন এ মজলিসের সদস্য। তারা ছাড়াও সাধারণ প্রজাদের মত প্রকাশের সম্পূর্ণ অধিকার ছিল। কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি তারা খলিফার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।

২. প্রদেশ নির্ধারণ: কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা রাষ্ট্রের একটি সুন্দরতম কার্যশৈলী। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় থাকে। আধুনিক যুগে প্রদেশভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার সুন্দর এ নীতিটি ছিল হজরত ওমর (রা.) এর সুচিন্তার ফসল। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা তার এই নীতিকে সম্মান জানিয়ে বেশ প্রশংসা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করেন। তার খেলাফত মক্কা, মদিনা, সিরিয়া, জাজিরা, বসরা, কুফা, মিসর ও ফিলিস্তিনÑ এ আটটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। আর তা গঠিত হয়েছিল কয়েকটি জেলার সমন্বয়ে। প্রত্যেকটি প্রদেশে নির্ধারণ করা হয়েছিল একজন করে গভর্নর। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পুরো রাজ্য চললেও প্রদেশ সরকার তার সীমানার প্রজাদের দেখভাল করতেন। প্রদেশ নির্ধারণে হজরত ওমর (রা.) এর পুরো রাজ্যে বয়েছিল শান্তি-সুখের অমল হাওয়া।

৩. দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ: ওমর (রা.) সরকারি কাজের জন্য যোগ্যতার মান অনুযায়ী সম্মানজনক বেতনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করেন। তাদের নিয়োগদানে স্বজনপ্রীতির কোনো আশ্রয় ছিল না। কর্মকর্তারা যেন কাজে কারচুপি না করতে পারে, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে ও অবৈধ পন্থায় উপার্জন না করতে পারে সে জন্য গোয়েন্দার মাধ্যমে সর্বদা তাদের নজরদারি করতেন। কেউ কোনো অপরাধে ধরা পড়লে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতেন। এ জন্য তার রাজ্য ছিল দুর্নীতিমুক্ত।

৪. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা: ওমর (রা.) এর শাসনামলে রাজস্ব ভূমি ছিল অর্থ জোগানের অন্যতম মাধ্যম। ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক, বিজিত অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত অর্থসম্পদ ও অমুসলিমদের থেকে সংগৃহীত ট্যাক্স রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো। দারিদ্র্যবিমোচনে তিনি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। দুস্থ ও অসহায় এবং সম্মানিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ ভাতার প্রচলন করেছিলেন তিনি।

৫. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: যে রাষ্ট্রে আইন-কানুন নেই বা থাকলেও দুর্বল, সে রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকে না। অল্পদিনেই ভাঙন ধরে। অনৈক্য আর অনাচারে ছেয়ে যায় পুরো রাজ্য। প্রজাদের মধ্যে ছড়ায় বিভেদ। তাই হজরত ওমর (রা.) রাষ্ট্রের সব দুর্নীতি রুখতে প্রতিষ্ঠা করেন আইনের শাসন। গঠন করেন পুলিশ ও সেনাবাহিনী। নির্মাণ করেন জেল ও আদালত। তাতে নিয়োগ করেন বিচারপতি। তার এ সদিচ্ছা সর্বতোভাবে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি অনেক সময় বাদী কিংবা বিবাদী বেশে আদালতে উপস্থিত হতেন। এ জন্য বিচার বিভাগেও শাস্তি প্রদানে কারচুপির কোনো সুযোগ ছিল না। সুন্দর এ আইন ব্যবস্থাপনার ফলে প্রজারা কোনো অন্যায় করার সাহস পেত না। আধুনিক আইনের নিয়ম-নীতি হজরত ওমর (রা.) এর গড়া নিয়মেরই প্রতিচ্ছবি।

৬. শাস্তি বিধান: হজের সময় ওমর (রা.) ঘোষণা করতেন, ‘কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে বলতে পারেন।’ এতে সাধারণ লোকজনও তাদের অভিযোগ খলিফার কাছে উপস্থাপন করতে পারত। হজরত ওমর (রা.) সূক্ষ্ম বিবেচনার মাধ্যমে তার প্রতিকার করতেন। কোরআন ও হাদিসে নির্ধারিত শাস্তি যথাযথভাবে কার্যকর করতেন। মদপানের শাস্তি ৮০টি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন। আর এসব শাস্তি প্রয়োগ সবার জন্য ছিল সমান। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচুর মধ্যে কোনো তফাৎ ছিল না। এটা ছিল তার ইনসাফ প্রতিষ্ঠার অনন্য নিদর্শন।

৭. তদন্ত বিভাগ গঠন: জনসাধারণের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসত, সেগুলো এবং অন্য সব অভিযোগ সুচারুভাবে খতিয়ে দেখতে হজরত ওমর (রা.) তদন্ত বিভাগ গঠন করেন। এর প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মোহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারি (রা.)। তিনি প্রজাদের সব অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনে গভীরভাবে তা তদন্ত করতেন। এরপর তার রিপোর্ট খলিফার কাছে পেশ করতেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।

৮. তদন্ত কমিশন গঠন: বড় ধরনের কোনো অভিযোগের তদন্ত রিপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করেন হজরত ওমর (রা.)। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে খলিফার দফতরে তলব করা হতো। অভিযোগ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হতো। বেশিরভাগ সময় প্রাদেশিক গভর্নরের পদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাপারেই এরূপ করা হতো।

৯. কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব গ্রহণ: হজরত ওমর (রা.) কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নিয়োগকালে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করে খলিফার দফতরে সযত্নে সংরক্ষণ করে রাখতেন। কারও সম্পদে অস্বাভাবিক উন্নতি দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ তার তদন্ত শুরু করতেন এবং এর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। এ জন্য কোনো কর্মচারী সুদ, ঘুষ গ্রহণ বা কোনো ধরনের দুর্নীতি করার সাহস পেত না।

১০. সুবিচারের প্রতিষ্ঠা: ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এ বিধান কথায় নয়, কাজে পরিণত করেছিলেন হজরত ওমর (রা.)। বিচারের ক্ষেত্রে উঁচু আর নীচু জাতের কোনো পার্থক্য করতেন না তিনি। শাস্তি প্রদানে নিজ ছেলেকেও রেহাই দেননি। মদপানের শাস্তিস্বরূপ ৮০টি বেত্রাঘাত করেন ছেলেকে। বেত্রাঘাতের ফলে ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং কয়েক দিনের মাথায় মারা যায়। আজকালকের সমাজে সুবিচারের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিরল।

১১. ফতোয়া বিভাগ গঠন: দৈনন্দিন জীবনে প্রজারা যেসব মাসআলা-মাসায়েলের সম্মুখীন হতো, তা সমাধানের জন্য হজরত ওমর (রা.) গঠন করেন ফতোয়া বিভাগ। অভিজ্ঞ মুফতি সাহাবায়ে কেরাম (রা.) দ্বারা এ বিভাগ পরিচালিত হতো।

১২. উন্নয়নমূলক কর্মকা: ওমর (রা.) নিজ শাসনামলে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে হাত রাখেন। ভূমি সংস্করণ, খাল-জলাধার খনন, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রাস্তা, ঘর ও মুসাফিরখানা নির্মাণ, বসতি স্থাপন, নতুন নতুন নগর ও শহরের সৃষ্টি ও তাতে সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাপনা ছিল তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য দিক।

হজরত ওমর (রা.) এর সুন্দর এ শাসন ব্যবস্থার ফলে পুরো রাজ্য ছেয়ে গিয়েছিল শান্তি, সাম্য ও সুখে। প্রজাদের মধ্যেও পরস্পর তৈরি হয়েছিল মিল-মহব্বত ও ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব মেলবন্ধন। বর্তমানে অমুসলিমরা হজরত ওমর (রা.) এর শাসন পদ্ধতি গ্রহণ করে নিজেদের রাষ্ট্রে তা বাস্তবায়ন করছে। আর মুসলিম শাসকরা তা থেকে সম্পূর্ণ বেখবর। মুসলিম শাসকদেরও হজরত ওমর (রা.) এর আদর্শ গ্রহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা উচিত।

Check Also

থার্টি ফাস্ট নাইট, জেনে নিন ইসলাম কি বলে

প্রতি বছর ইংরেজী ৩১সে ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ০১ মিনিট থেকে ঘৃণ্য বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে …