Friday , February 23 2018
Home / এক্সক্লুসিভ / অন্ধকারের মধুরাণী শোভা, রাতের ঠিকানা ফার্মগেট পার্ক

অন্ধকারের মধুরাণী শোভা, রাতের ঠিকানা ফার্মগেট পার্ক

কথায় ফুল ঝরায়। কথাতেই মুক্তা ফলায়। কথার বাণে অশান্ত মন শান্ত বানায়। ওপাড়ায় সবাই ওকে মধুরাণী বলে জানে। মধু ওর নাম না। তবুও কথা সুরায় ‘মধু’ নাম পড়েছে ওর। মৃদু স্বর, ধীর উচ্চারণ অথচ শুদ্ধতায় ভরা। ছোট ছোট বাক্য শুনতে যে কারোরই কান পাততে মন চাইবে। মন চাইবে কথার এ জাদুকারের কাছ থেকে কথার জাদু শেখা।

শোভার নিশি ঠিকানা ফার্মগেট পার্ক। দিনে ঘুমায় অন্য হিজড়াদের সঙ্গে ধানমন্ডীর একটি বাসায়। শোভার মতো ওরাও একইপেশায় জীবনের চাকা ঘুরায়। রাত হলেই ঘরের দরজা খোলে শোভারা। ছড়িয়ে পড়ে রাতের আলো-আঁধারের রঙ্গমহলে। পার্ক, ফুট ওভার ব্রিজ, সড়কের অন্ধকার মোড়ে মোড়েই ওরা কুঞ্জ সাজায়।

সড়কের ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়েই ওরা খদ্দেরের মনে আলো ফেলে। ল্যাম্পপোস্টের আলো ওদের ছোঁয় না, ঠিক যেন ‘বাতির নিচে অন্ধকার’। তবে ল্যাম্পপোস্টের আলো-ই ফিকে হয়ে আসে ওদের মুখজুড়ে মাখা কড়া মেকআপের রংয়ে।

অমন রূপেই শোভার দেখা সেদিন। বেণী করা নকল চুলের আগা শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর ছুঁতে চাইছে। কনকনে ঠান্ডা। ঘণ্টার কাঁটা তখন ঘড়িতে রাত তিনটার ঘরে। গাছের পাতার ডগায় ফোটা ফোটা শিশির কণা জমে টপটপ করে পড়ছে আর তাতে পিচঢালা সড়ক ভিজে যাচ্ছে। শিশির ফোটা পড়ছে শোভার গায়েও। শীত তাড়াতে পাতলা সোয়েটার শরীরে। ভারি জামা পরলে খদ্দের সামলাতে মুশকিল হয় ওর।

সেভ করেছে আগ রাতে। তবুও মেকআপ ভেদ করে দাড়ি-গোঁফের মাথা বেরুতে চাইছে মধ্যরাতেই। রোজ সেভ করাতেই দাড়ি নিয়ে এ বিপত্তি এখন। দাড়ি দেখলে খদ্দের মুখ ফেরায় বলে, এখন মেকআপের প্রলেপ ঘন করতে হয় ওকে। কপালে কালো টিপ ওর হৃদয়ের ক্ষতকে সাক্ষী মানছে। হলদে সালোয়ার-কামিজে সোডিয়াম আলো পড়ায় রূপ যেন উতরে পড়ছে। পুরুষের বিকৃত লালসা মেটাতে হিজড়া শোভাকে পুরুষ সত্বা চাপা দিয়ে এভাবেই নারী সাজতে হয় রোজ রোজ।

অমন রূপ মেলে ধরেও এদিন খদ্দের মিলছে না ওর। অতি ঠান্ডাই বাগড়া বাঁধিয়েছে। এরমধ্যে পার্কে নারী কর্মীর সংখ্যাও বেড়েছে। নারীরা এলে হিজড়াদের কদরে ভাটা পড়ে। রাতের এ বেলায় অলস সময় কাটছিল বলে বাইক থামাতেই এগিয়ে এলো শোভা।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মধুমাখা কথার ঝুড়ি খুলে বসলেন। কিশোরগঞ্জে জন্ম নেয়া শোভার পরিবারে দুই ভাই এক বোন। ভাইদের মধ্যে শোভা ছোট। বোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিল শোভারও। শরীরই বিপত্তি হয়ে দেখা দেয় ওর। ছেলে হয়ে জন্ম নিলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রূপ বদলাতে থাকে। বদলায় মনের রূপও।

শত স্বপ্ন নিয়ে জন্মে কৈশোরেই নাম লেখাতে হয় হিজড়া বনে। এরপরেই অভিশাপ আর শত লাঞ্ছনা নেমে আসে জীবনে। বেঁচে থাকার তাগিদে হাঁটছেন এখন অন্ধকার গলির চোরাপথে। ছেলের জন্মের পর পরিবার দিয়েছিল অন্য নাম। হিজড়া খাতায় নাম লিখিয়ে হয়েছে শোভা। শুধু মিষ্টি কথাই রপ্ত করেনি ও। নৃত্য আর গানেও অনন্য। বেশ কয়েকটি চ্যানেলে ক্ল্যাসিক্যাল নৃত্যও পরিবেশন করেছে ইতোমধ্যেই।

এমন মিষ্টি ভাষা রপ্ত করা হলো কীভাবে- জানতে চাইলে বলেন, হিজড়াদের ব্যাপারে মানুষের একটি খারাপ ধারণা আছে। বিশেষ করে হিজড়াদের ভাষা আর ব্যবহার নিয়ে মানুষ আতঙ্কে থাকে। এটি আমাকে কষ্ট দেয়। আমরাও তো মানুষ। তাহলে অন্য মানুষের ভয়ের কারণ হবো কেন? কথার চেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর কি আছে? মূলত পরিবার থেকেই মানুষের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলা শিখেছি। শিখছি এখনও। আর এ কারণে মানুষেরা আমায় ভালোও বাসে। ভালোবাসে ক্ষণিকের প্রেমে মজে থাকা খদ্দেরেরাও।

Check Also

নুহ (আ.) মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন: তুরস্কের অধ্যাপক

তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটির মেরিন সাইন্স ফ্যাকাল্টির এক অধ্যাপক ইয়াবুজ অর্নেক দাবি করেন ইসলাম ধর্মের নবী …